রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৬ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
হবিগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখার মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের সাথে সংবাদপত্রের সম্পাদক ও বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ২০ বছরের ব্যবধানে মা-ছেলের বাঁশখালী সফর অভয়নগরে ১,৪১৭ পিস ইয়াবা সহ শীর্ষ মাদক ডিলার আকাশ ও সুমন গ্রেফতার  জুলাইয়ের শহীদ ও আহত ১০ ব্যক্তির পরিবারের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী সিরাজগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত ২।  যশোরে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ১ যুবক ও ২ নারী সদস্য গ্রেফতার  জনসাধারণ আমি, আমিই জনসাধারণ’স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ে বললেন ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী যৌথ অভিযানে ৯ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধার ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

চট্টগ্রামে জব্বারের বলিখেলা ও শতবর্ষী বৈশাখী মেলায় খাট-পালং থেকে খেলনাকী নেই!

  • প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮১ বার পড়া হয়েছে

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা-কে কেন্দ্র করে বসা বৈশাখী মেলা আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। খাট-পালং থেকে শুরু করে রান্নাঘরের সামগ্রী, ঘর সাজানোর জিনিস, শিশুদের খেলনা—সব মিলিয়ে এটি যেন এক বিশাল অস্থায়ী বাজার। ২৪ এপ্রিল(শুক্রবার) আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই শতবর্ষী মেলা ঘিরে আন্দরকিল্লা থেকে লালদীঘি পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান, মাঝখানে মানুষের ঢল—কেউ কেনাকাটায় ব্যস্ত, কেউ আবার শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাঁশির সুর, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর মানুষের কোলাহলে পুরো এলাকা হয়ে উঠেছে প্রাণচঞ্চল।লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে এই মেলা। কে সি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড় হয়ে কোতোয়ালি পর্যন্ত বিস্তৃত এই আয়োজন যেন এক চলমান জনসমুদ্র। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে, আর সন্ধ্যা নামলে আলোর ঝলকানিতে মেলা পায় ভিন্ন এক রূপ। দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে ঘরের প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্য। খাট, আলমারি, ঝাড়ু, থালাবাসন, দা-বঁটি-ছুরি, আয়না—সবই তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, চেয়ার, তাকসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র।মেলায় ঘুরতে গেলে চোখে পড়ে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া। একতারা, দোতারা, ডুগডুগি, বাঁশি—এসব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।কুষ্টিয়ার লালনের আখড়ার পাশ থেকে আসা মোহাম্মদ সাজু জানান, ছোটবেলা থেকেই এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। এখন নিজেই তৈরি করে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, “এখানে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।”রাজশাহীর গগন মণ্ডল চার দশক ধরে বাঁশি বিক্রি করছেন। মাঝে মাঝে নিজেই বাঁশি বাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেন। তাঁর মতে, “এই মেলা শুধু বিক্রির জায়গা না, এটা এক ধরনের আনন্দ।”এই মেলা হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার বড় উৎস। চন্দনাইশ থেকে আসা ঝাড়ু বিক্রেতা আবদুল মান্নান প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় আসছেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিনেই ভালো বিক্রি হয়েছে, সামনে আরও আশা আছেদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিক্রেতারা কয়েকদিন আগেই এসে দোকান বসিয়েছেন। অনেকের জন্যই এই কয়েক দিনের আয় সারা বছরের বড় অংশ জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।মেলার সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায় শিশুদের ভিড়ে। খেলনার দোকানগুলোতে সারি সারি সাজানো রঙিন পুতুল, প্লাস্টিকের গাড়ি, ঘুড়ি, বাঁশের খেলনা, দোলনা—সবই শিশুদের আকৃষ্ট করছে।অনেক শিশুই খেলনা হাতে নিয়ে বায়না ধরছে, আর অভিভাবকেরাও শেষ পর্যন্ত কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিক্রেতারাও নানা কৌশলে শিশুদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।মেলার আরেকটি বড় আকর্ষণ খাবারের দোকান। মণ্ডা, মিঠাই, চানাচুর, টফি, আচার—বিভিন্ন ধরনের খাবারের পসরা সাজানো।আগ্রাবাদ থেকে আসা কার্পেট-পাপুস বিক্রেতা সুমন জানান, প্রতি বছরই তিনি এখানে আসেন। শিশুদের উপস্থিতির কারণে বিক্রিও ভালো হয়।মেলায় আসা গৃহিনী হুমায়রা জানান, জব্বারের বলি খেলা ও বৈশাখী মেলা এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং একটি সামাজিক মিলনমেলা। এই মেলার জন্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নারী পুরুষ শিশুরা অপেক্ষা করে।চট্টগ্রাম সরঃ কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র সাহিল বলেন, ছোট জায়গাতেও গাছ লাগানোর শখ থেকে তিনি টব কিনেছেন।অন্যদিকে, আসকারদিঘীর এক দম্পতি জানান, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তারা দা-বঁটি-ছুরি কিনে রাখছেন।অনেকেই বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে এখানে আসেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ লাইভ করছেন—সব মিলিয়ে এটি আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন১৯০৯ সালে সূচনা, ইতিহাসে প্রতিরোধের বার্তাএই বলিখেলার সূচনা হয় ১৯০৯ সালে বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর-এর হাত ধরে। ব্রিটিশ শাসনের সময় তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে কুস্তির আদলে এই খেলার প্রচলন করা হয়।ইতিহাসবিদদের মতে, এই ধরনের ক্রীড়া আয়োজনের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল প্রতিরোধের চেতনা। শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের শক্তিশালী করে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।আজ বলীদের লড়াইআজ শনিবার বিকেল ৩টায় লালদীঘি ময়দান-এ বসবে মূল আকর্ষণ বলীখেলা। এবার অংশ নিচ্ছেন ১০৮ জন বলীগতবারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার বাঘা শরীফ এবং রানার্সআপ রাশেদ বলীকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। হাজারো মানুষ এই লড়াই দেখতে লালদীঘি মাঠে ভিড় করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অনন্য আয়োজনপ্রতিবছর ১২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হওয়া এই বলীখেলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক করোনা মহামারির সময় বন্ধ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে নতুন উদ্যমে।আজ এটি শুধু একটি খেলা নয়—চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। লালদীঘির মাটিতে দাঁড়িয়ে বলীদের লড়াই যেন শত বছরের ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে।শহর বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু এই মেলার আবেদন একটুও কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য, উৎসব আর আনন্দের এক অনন্য ঠিকানা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews