
গাইবান্ধা থেকে মোঃ আবু জাফর মন্ডলঃ
কেলেঙ্কারি: সাংবাদিক হেনস্তাসহ ঘটনায় প্রশাসনিকতদন্ত শেষ
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় অর্পিত (সরকারি) সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ এবং এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তদন্ত শেষে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
রোববার (২১ জুন) দুপুরে গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আশরাফুল ইসলাম এ তদন্ত পরিচালনা করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। এ সময় সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু, যমুনা টেলিভিশনের প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান মণ্ডল পলাশসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা উপস্থিত থেকে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুন সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট এলাকায় অবস্থিত অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি হিসেবে উপস্থাপন করে প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত সরকারি দপ্তরের পরস্পরবিরোধী দুটি প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য নিতে কয়েকজন সাংবাদিক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিনের কার্যালয়ে যান।
এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) উত্তেজিত আচরণ করেন এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
ঘটনার ভিডিওচিত্র এবং সংবাদ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্ত শেষে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তদন্তের সার্বিক তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে খুব দ্রুত বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ থাকবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জুন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদুল্লাপুর উপজেলার হাসানপাড়া মৌজার অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে দেখিয়ে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করা হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় হাসানপাড়া মৌজার ১/১ ও ২৩৭ বিআরএস খতিয়ানের সাবেক ৭৬ ও ১১২ নম্বর দাগের প্রায় সাড়ে ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ওই জমির বিপরীতে জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে অধিগ্রহণকৃত জমিটি সরকারি অর্পিত সম্পত্তি। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে পীরগঞ্জ উপজেলার এক ব্যক্তি জেলা প্রশাসকের এলএ শাখায় লিখিত আবেদন করেন। তার অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে ক্ষতিপূরণের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে সরকারি দুটি প্রতিবেদনের পরস্পরবিরোধী তথ্য। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই বলে উল্লেখ করা হলেও, ২০২৫ সালের আরেক সরকারি প্রতিবেদনে একই সম্পত্তিতে সরকারের স্বার্থ থাকার কথা বলা হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সম্পত্তি নিয়ে এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্নও তৈরি করছে। এখন প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় জনগণ।